সমন্বয়হীনতা চলতে থাকলে লকডাউন-শাটডাউনে সফলতা আসবে না

দেশে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির অবনতি ঘটছে দ্রুত। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। আগের চেয়ে অনেক বেশি শনাক্ত হচ্ছে নতুন রোগী। প্রতিবেশী ভারতে সম্প্রতি করোনা যে পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, তেমনি কিছু এ দেশে হলে সামলানো যাবে কি-না তা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টরাই সন্দিহান।

এ অবস্থায় আগাম সতর্কতা হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লকডাউন বা শাটডাউন নামে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যবস্থাপনার দিকেও মনোযোগ দেয়ার কথা বলে আসছেন তারা। ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে ঘোষিত সীমিত পরিসরে লকডাউন চলছে। ১ জুলাই থেকে শুরু হবে কঠোর লকডাউন, যা বাস্তবায়নে মাঠে নামবে সেনাবাহিনী-বিজিবিও।

কিন্তু অতীতের লকডাউন বা বিধিনিষেধের অভিজ্ঞতায় বিশ্লেষকরা এসব সীমিত বা কঠোর লকডাউনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়েও সন্দিহান। তারা বলছেন,

অতীতে সরকারের তরফ থেকে লকডাউনের মতো পদক্ষেপ ঘোষিত হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো সমন্বয় দেখা যায়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে লকডাউন বা শাটডাউন, যা-ই ঘোষণা করা হোক, কোনো সুফল দেবে না।

লকডাউন পরিস্থিতি এবং নাগরিকদের জীবনযাপন প্রসঙ্গ নিয়ে জাগো নিউজ কথা বলেছে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবিএম মির্জা আজিজুল ইসলাম,

ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে।

করোনা ও লকডাউনে জীবন ও জীবিকার মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে এবিএম মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘লকডাউনের মতো কঠোর কর্মসূচি নিতেই হবে। কারণ আমাদের আশপাশের দেশগুলো খানিক রিলাক্সে থাকলেও তারা এখন কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াও লকডাউনে যাচ্ছে। আমাদের তো অন্য কোনো উপায় নেই। এতে করে যে ক্ষতি হবে তা মেনে নিতেই হবে। কিন্তু ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যে সমন্বয় দরকার, তাতে ব্যাপক ঘাটতি আছে।’

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘করোনা মহামারির আমরা দেড় বছর পার করলাম। এটি কম সময় নয়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তা অনুমান করা যাচ্ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট যখন বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন বোঝাই যাচ্ছিল আমাদেরও এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অথচ আমরা সেই রকম প্রস্তুতি নিতে পারিনি।’

লকডাউন নিয়ে শুরু থেকেই এক ধরনের লুকোচুরি ছিল মন্তব্য করে মির্জা আজিজুল বলেন, ‘সমন্বয় ছিল না। সরকারের একেক ব্যক্তি একেক রকমের তথ্য সরবরাহ করেছেন।

দোকানপাট খোলা রেখে লকডাউন, পরিবহন বন্ধ না করে লকডাউন, এমনকি লকডাউনের মধ্যে নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় সরকারের দেয়া তথ্য কাজে দিচ্ছে না।’

‘আবার মহামারির এ সময়ে কতজন মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, তারও সঠিক তথ্য নেই। সরকার যে সহায়তা দিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সঠিক ব্যক্তি সহায়তা পাচ্ছেন না। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আছে।

এমন নীতি অবলম্বন করে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন। ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। অথচ বিপুল এই জনগোষ্ঠীর জন্য প্রথম থেকেই সহায়তা প্রদান করা দরকার ছিল’—বলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ উপদেষ্টা।

অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘করোনার যে ধাক্কা তা অনেকেটাই হাতের বাইরে। কিন্তু হাতের ভেতরের বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করতেই পারি এবং এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আগেই আমাদের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে হচ্ছে। তবে দ্বিতীয় ঢেউ একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।’

‘কোভিড-১৯ পরিস্থিতি তথা স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের জন্য। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমরা কী বার্তা দিচ্ছি মানুষকে। লকডাউন দেয়া হলো বেশ কয়েকবার এবং বিভিন্ন আঙ্গিকে।

কিন্তু লকডাউনের মধ্য দিয়ে মানুষকে আসলে কী মেসেজ দেয়া হচ্ছে? তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানুষের বেঁচে থাকা অর্থাৎ জীবন-জীবিকার ব্যবস্থাপনা। এ তিনটি বিষয় আলাদা করে চিহ্নিত করা দরকার এবং এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা অতিজরুরি।’

ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘যেসব দেশ কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সফলতার পরিচয় দিয়েছে, তারা এই তিনটি বিষয়েই অধিক গুরুত্ব দিয়ে সফল হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, বার্তা দেয়া এবং অর্থনীতিকে ম্যানেজ করেছে অতিদক্ষতার সঙ্গে।

অথচ আমাদের এখানে দেখবেন তিনটি বিষয় নিয়েই সরকারের মধ্যে স্ববিরোধিতা আছে। বিশেষ করে বার্তা দেয়ার ক্ষেত্রে চরম সমন্বয়হীনতা শুরু থেকেই ছিল, এখনও আছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে না উঠলে লকডাউন-শাটডাউন কোনো কিছুতেই সফলতা আসবে না।’

এ প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে, তা বোঝা যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামলে আনতে লকডাউনের মতো কঠোর অবস্থান নেয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ইউরোপ-আমেরিকাও তাই করেছে।

আমরা হয়তো সেরকম পারব না। কিন্তু চেষ্টা তো হতে পারে। সে চেষ্টায়ও যদি তথ্যের গরমিল থাকে, তাহলে কোনো কিছুই আর কাজে আসে না। এ কারণে লকডাউনের প্রতি মানুষের আস্থাও নেই। বরং সরকারের দেয়া বিভ্রান্তিকর তথ্যই আতঙ্ক বাড়াচ্ছে।’

‘ভারত বা অন্যান্য দেশের মতো হলে আমরা বেসামাল হয়ে পড়ব। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কাছে সঠিক তথ্য আছে বলে মনে হয় না। করোনায় ৬০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্ত্রী জানালেন।

কিন্তু সংখ্যাটা আরও বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ৬০ লাখ মানুষকেই সরকার কীভাবে সহায়তা করছে? প্রণোদনা বা সহায়তার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু তা নিয়ে নানা সংশয় আছে।’

সাবেক এ গভর্নর বলেন, ‘আমি মনে করি, গরিব বা সাধারণ মানুষকে নগদ সহায়তার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা জরুরি। মানুষের হাতে নগদ টাকার সংস্থান করতে হবে। লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ল। চাকরি হারিয়ে প্রবাসীরাও দেশে ফিরছেন।

কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষদের নিয়েও সঠিক তথ্য নেই। তার মানে তথ্যের ঘাটতিই পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও যেমন মানুষ বিভ্রান্তিকর তথ্য পাচ্ছে, তেমনি লকডাউন নিয়েও বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিভ্রান্ত হচ্ছে আর্থিক সহায়তার পরিসংখ্যান নিয়েও।’

Leave a Comment